কৃষি ফেনী বিনোদন

সবুজ অরণ্যের বীজভূমিঃ ফেনী হর্টিকালচার সেন্টার

feni horticulture center

আমিরুল ইসলাম>>

দু পা গেলেই এক টুকরো অরণ্যঃ
শহর থেকে অল্প দুরেই সুবজের মিলনমেলায় পরিবেষ্টিত ছায়াসুনিবিড় আম, জাম, কাঁঠালসহ হরেক রকম ফুল-ফলফলাদির এক অনন্য সুবজ উদ্যান, অরণ্যের বীজভূমি ফেনী হর্টিকালচার সেন্টার। ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা সম্মোহিত পরিবেশে যেন অরণ্যের সজীবতা। ফেনী শহর থেকে তিন কিলোমিটার পশ্চিমে, পাঁচগাছিয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে গড়ে উঠেছে কয়েকশ একর ব্যাপ্তি বিশাল বীজ উৎপাদন খামার-ফেনী হর্টিকালচার সেন্টার। সবুজের সমারোহে শান্ত, ছায়াঘেরা আম, জাম, হাজার হাজার সুপারী ও নারিকেল গাছের বিশাল সমৃদ্ধ বাগানের অনন্য স্নিগ্ধ পরিবেশে মুগ্ধ হয়ে যাবেন যে কেউ। স্থানীয়রা একে নারকেল বাগান বলে ডাকেন। বাগানের প্রবেশ মুখেই সারি বেঁধে লাগানো নারকেল গাছের সারি দর্শনার্থীদের বাগানে স্বাগত জানাতে তৈরি সবসময়।

বাগান ভর্তি ফুল, ফল, সব্জির অপরূপ সমারোহঃ
এক কথায় বৃহত্তর নোয়াখালীর বীজ ভান্ডার ফেনী হর্টিকালচার সেন্টার। ফুল, ফল, সব্জি আর শস্য বলতে যা বোঝায়-তার সবই রয়েছে এখানে। ভেতরে বাঁ দিকে হাজার হাজার নারকেল আর সুপারী গাছ। ভেতরে দক্ষিণ দিকটায় নানারকম ফুল, ফল, সব্জি আর শস্যের বেড বা বিছানা। রয়েছে ফলের চারা, ফলের কলম, মসলা চারা, বনজ চারা, সবজি চারা (শীতকালীন, গ্রীষ্মকালীন), ঔষধী চারা, নারকেল, সুপারী, শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষ ও ফুলের চারা অগনিত সমাহার। শুধু বাংলাদেশের উদ্ভিদই নয়, আছে বিদেশী বহু জাতের ফুল, ফল, সব্জি। এখানে চলছে চারা উৎপাদন, পরীক্ষা-নীরিক্ষা, গবেষণা। এখানকার কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য নিরলস গবেষণা করে চলেছেন। এখানে কৃষকদের হাতে কলমে বিভিন্ন কলম তৈরীর পাশাপাশি বিভিন্ন ধানের আপদকালীন বীজতলা, ভিনিয়ার কলম তৈরী পদ্ধতি, গুটি কলম তৈরীর পদ্ধতি, নাশপাতি গাছে গুটি কলম, শীতাকে মাশরুম চাষ পদ্ধতি, ড্রাগন গাছের ফুল ও চাষ পদ্ধতি শেখানোর পাশাপাশি কৃষকদের সবরকমের সহায়তা, সাহায্য ও পরামর্শ দিচ্ছেন। ফেনীর গন্ডি পেরিয়ে এর পরিধি ছড়িয়ে পড়েছে নোয়াখালী, লক্ষীপুর, কুমিল্লা, সীতাকুন্ডসহ আশপাশের এলাকায়। ফেনী হর্টিকালচার সেন্টার বা ফেনী বীজ উৎপাদন খামার ঘুরে দেখতে ভীড় জমান বিভিন্ন এলাকার চাষী ও প্রকৃতিপ্রেমী দর্শনার্থীরাও। অনেকেই আসেন এখানকার তৈরী বীজ সংগ্রহের জন্য। পাশেই বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) খামার। চলছে নানা জাতের ধান নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত সেখানকার কৃষিবিদরা।

সেন্টারের কার্যক্রম ও লক্ষ্যঃ

ফেনী হর্টিকালচার সেন্টার প্রতি বছর ফল, ফুল, কন্দাল, সবজী ও ঔষধী গাছের মানসম্মত চারা ও কলম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন ও তা বাস্তবায়ন করে সূলভ মূল্যে বিক্রয় করে থাকে বলে জানান খামারের উপ পরিচালক আব্দুর রশিদ। দেশ বিদেশের গবেষনা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উদ্ভাবিত ফল, ফুল, কন্দাল ও সবজীর জাত সমূহ সংগ্রহ করেন তারা। সে জাতগুলোর এদেশের মাটি ও আবহাওয়া উপযোগীতা যাচাই করে উপযোগী জাত সমূহ দ্বারা মাতৃবাগান সৃজন করা এবং সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকেন। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিশেষ বৈশিষ্টস¤পন্ন (আগাম, নাবী ও বারমাসি) বিভিন্ন ফলের গাছ মাতৃবৃক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করে সেখান থেকে সায়ন সংগ্রহ করে কলম তৈরী ও ঐসব জাতের সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করে থাকেন তারা। এখানে প্রতিনিয়ত চলছে চারা উৎপাদন, পরীক্ষা-নীরিক্ষা, গবেষণা। এখানকার উল্লেখযোগ্য একটি উদ্ভাবন হচ্ছে ব্যানানা ম্যাঙ্গো। এটি সারাদেশের ফলাহারি মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। সারাদেশ থেকে লোকজন আসেন এ আমের চারা সংগ্রহের জন্য। এখানে মাশরুম চাষের বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। একজন অতিরিক্ত পরিচালক, দুইজন উপ-পরিচালক, দুইজন  অতিরিক্ত উপ-পরিচালক, একজন উদ্যানতত্ত্ববিদ, একজন সহকারী উদ্যানতত্ত্ববিদ এবং একজন গবেষণা কর্মকর্তা কারিগরী ও দাপ্তরিক কাজে পরিচালককে সহায়তা প্রদান করছেন বলে জানান এ সেন্টারের উপপরিচালক।

দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরন ও পুষ্টি সমস্যা সমাধান, মানব স¤পদ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র দূরীকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় লাগসই প্রযুক্তি প্রয়োগ, পরিবেশবান্ধব কৃষি, উচ্চমূল্য ফসল উৎপাদন ও রপ্তানীমুখী কৃষি পন্য উৎপাদনে কৃষক ও উদ্যোক্তাদের চাহিদামাফিক সেবা প্রদানের লক্ষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কৃষি মন্ত্রনালয়ের আওতাধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইং সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান খামারের উপপরিচালক। উদ্যান ফসল সম্প্রসারণ, মাতৃবাগান সৃজন, জার্মপ্লাজম সংরক্ষণ এবং মান স¤পন্ন বীজ, চারা, কলম উৎপাদন এবং সুলভ মূল্যে সরবরাহে সেন্টারটি এর মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। দেশী ফলের পরিচিতি বাড়ানো ও বার মাস ফল প্রাপ্যতার কৌশল নির্ধারণ, বানিজ্যিক নার্সারী স্থাপনে সহযোগিতা, নতুন ফল বাগান সৃজন ও বাগান ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশে উদ্যান ফসল উৎপাদনের সমস্যাবলীর সমাধান প্রদানে দেশে ৭৩টি হর্টিকালচার সেন্টার রয়েছে বলে জানান সেন্টারের উপপিরচালক।

স্বাদে ও গন্ধে চমক লাগানো ব্যানানা ম্যাংঙ্গোঃ
এখানকার উল্লেখযোগ্য একটি উদ্ভাবন হচ্ছে ব্যানানা ম্যাঙ্গো। এটি সারাদেশের ফলাহারি মানুষের মাঝে ইতোমধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। সারাদেশ থেকে লোকজন আসছে এ আমের চারা সংগ্রহের জন্য। খামারের উপ পরিচালক আব্দুর রশিদ জানান, আমের এ জাতটি থাইল্যান্ড থেকে ২০০২ সালে ফেনী হর্টিকালচার সেন্টারে নিয়ে আসেন উদ্যানতত্ত্ববিদ সঞ্চয় কুমার কয়েলদার। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে মেহেরপুর, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারসহ বিভিন্ন সেন্টারে ছড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ জাতের আম চাষ করে ব্যাপক সফলতা পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে এ আম চাষের উপযোগিতা বিবেচনা করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ২০১০ সালে এ জাতটিকে বাউ আম-১৪ হিসেবে অবমুক্ত করে। তবে থাইল্যান্ডে এ জাতটিকে বলা হয় সিনথোলিন। তিনি আরও জানান, বামন আকৃতির বলে এ জাতের আমগাছ ২০-২৫ ফুট দূরত্বে লাগানো যায়। অর্থাৎ একরে ১১০টি আমগাছ রোপণ করা যায়।

এছাড়া যারা শখের বশে বাড়ির ছাদে চাষ করতে চান, তাঁরাও বড় আকৃতির টবে ছয় বছর পর্যন্ত এই জাতের আম চাষ করতে পারেন। খামারের উপ পরিচালক আব্দুর রশিদ বললেন, এ আম পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আমগুলোর একটি। এ আম দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেননা এ আম সারা দেশেই চাষযোগ্য। নাবীজাতের কারণে এ আম বাণিজ্যিক দিক থেকেও লাভজনক। জুন মাসের শেষ থেকে জুলাইয়ের মধ্যভাগের মধ্যে এই আম পাকে। অন্যান্য সাধারণ মিষ্টি আমের চেয়ে একটু বেশি মিষ্টি। কলার মতো লম্বা বলে একে বলা হয় ব্যানানা ম্যাংগো। এর খোসা ও আঁটি কাগজের মতোই পাতলা। ফলে এর ভক্ষণযোগ্য অংশ ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ। লম্বায় ৯ থেকে ১০ ইঞ্চি। ওজন ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম। আমটির চারা সংগ্রহের জন্য দুর দুরান্ত থেকে অনেকেই এখানে আসেন। এছাড়া এখানে নিত্যনতুন বিদেশী জাত নিয়েও গবেষনা করা হয়। বাগানে আছে বেশ কয়েকটি কফি গাছ। এ দেশীয় আবহাওয়ায় টিকে থাকার মত করে উদ্ভাবিত জাতটি পরীক্ষাধীন।

স্বয়ংসম্পূর্ণ বীজ উৎপাদন খামারঃ
ফেনী বীজ উৎপাদন খামারে সবই আছে। ফলের মধ্যে আছে বিভিন্ন জাতের আম, পেয়ারা, লেবু, বাতাবি লেবু, কুল, ডালিম, গোলাপজাম, কমলা, জলপাই, কাঁঠাল, তেঁতুল, কদবেল, আমড়া, কালোজাম, লটকন, আতাফল, করমচা, পেঁপে বিলুম্বী, চেরীফল, চালতা, ঢেউয়া, শরিফা, অরবরই, ড্রাগনফ্রুট, বিলাতীগাব, আনারস, মাল্টাসহ নানা দেশী বিদেশী ফল। রয়েছে বিভিন্ন মসলার চারা। রয়েছে তেজপাতা, দারুচিনি গোলমরিচ, এলাচি, কাবাব চিনি। রয়েছে সাধারণ দেশী মরিচ, পোটকা মরিচ, কালিমরিচ, সিমনাথ বেগুন, তাল বেগুন, হাইব্রিড লাউ, শিম, শসা, তিতা করলা, মিষ্টি কুমড়া, শসিন্দা, স্কোয়াশ, আলু, টমেটো, চাল কুমড়াসহ নানা জাতের দেশী-বিদেশী সব্জির চারা। ফলের মধ্যে রয়েছে শানতোল, নারিকেল (সিংহলী), নারিকেল (মালয়পিং), নরিকেল (ডোয়ার্ফ)। ফুলের মধ্যে আছে নানা জাতের গোলাপ, জবা, বেলি, গন্ধরাজ, পাতাবাহার ইত্যাদি। অন্যান্য গাছের মধ্যে আছে জাবটিকাবা, বনফুল, উইপিং দেবদারু ইত্যাদি। ঔষধী চারা মধ্যে রয়েছে নিম, বহেরা, হরিতকি উল্লেখযোগ্য।

অল্প দামে পেতে পারেন সবঃ

ফেনী হর্টিকালচার সেন্টারের উপ সহকারি পরিচালক কাজী হেনা মেহেদী জানান, যে কেউ এখান থেকে অল্পমুল্যে যেকোন বীজ সংগ্রহ করতে পারেন। এখানে স্বল্পদামে ফল, ফুল, ধান ও সবজির চারা কিনতে পারা যায়। এখানে আম কলম  (দেশী) উন্নত ৪০টাকা, আম কলম  (বিদেশী/ হাইব্রিড) ৬০, লিচু কলম ৪৫, সফেদা কলম ৪০, পেয়ারা কলম ২০, বাতাবি লেবু কলম  (দেশী উন্নত) ২০, বাতাবি লেুব কলম (হাইব্রিড) ২৫টাকা, কামরাঙ্গা কলম  (দেশী উন্নত) ২০ টাকা,  কামরাঙ্গা কলম (হাইব্রিড) ৩০, জামরুল কলম ২০, জামরুল কলম (হাইব্রিড) ৫০, সাজিনা কাটিং  (বারোমাসী) ২০, লটকন কলম ৩০, নাশপাতি কলম ৩০, নারকেল চারা (দেশী) ৫০, নারকেল চারা (বিদেশী) ৬৫, সুপারি চারা ১০, পেঁপে চারা ৫ অন্যান্য সকল ফলের চারা ১০টাকা দামের মধ্যে পাওয়া যায়। বিভিন্ন ফুলের কলম যেমন- দেশী গোলাপ কাটিং ২০, বিদেশী গোলাপ কাটিং ৩৫, জবা ১৫, মেসান্ডা ১৫, ইক্সোড়া ১৫, বেলী ১৫, অ্যালমন্ডা ১৫ ও অন্যান্য শোভাবর্ধনকারি চারা ২০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়।  এছাড়া সকল বনজ চারা ও ঔষধী চারা ১০ টাকার মধ্যে পাবেন।

সর্বশেষঃ
খামারের উপপরিচালক আব্দুর রশিদ জানালেন, বাংলাদেশে ফল ও ফুলের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধি করা শাকসব্জী, মশলা ও কন্দাল ফসলের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধি করা ফলমেলার আয়োজন ও ফলবৃক্ষ রোপন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রতি বৎসর জুন মাসে এ উইং এর মাধ্যমে দেশব্যাপী ফলদ বৃক্ষরোপন পক্ষ উদযাপন করে থাকে। এ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ফলমেলার অয়োজন করা হয়। ঐসব মেলায় দেশের বিভিন্ন স্থানে উৎপাদিত প্রচলিত ও অপ্রচলিত ফল প্রদর্শনের মাধ্যমে এসব ফল চাষাবাদে জনসাধারণ ও কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয় এবং কৃষক পর্যায়ে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে ফলের চারা সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ফলদ ও ঔষধি বৃক্ষ রোপনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ কৃষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করা হয়ে থাকে। যেকেউ চাইলে এখান থেকে চারা, বিনামুল্যে প্রশিক্ষণ নিয়ে চাইলে নিজস্ব অরণ্য সৃজন করতে পারেন।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *