রাজনীতি

ফেনীর রাজনীতি: জেলা বিএনপি নেতাদের কোন্দলে বিপর্যস্ত দল

খালেদা জিয়ার নিজ জেলা ফেনীতেই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে বিপর্যস্ত অবস্থায় আছে বিএনপি। তার ওপর নেতাদের একাংশ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে চলা নিয়ে সাধারণ কর্মীদের মধ্যে রয়েছে অসন্তোষ।
জেলায় দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতা বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরেই এ জেলায় বিএনপির রাজনীতি চলছে চরম অগোছালো ও বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্য দিয়ে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ‘অযোগ্য’ নেতৃত্বের কারণে দল এ অবস্থার মধ্যে পড়েছে। তার ওপর গত ৫ জানুয়ারির পর জেলার বিভিন্ন থানায় তিন শতাধিক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে দলের প্রায় তিন হাজার নেতা-কর্মীকে। এঁদের কেউ কেউ কারাগারে, কেউ বাড়ি-ঘরছাড়া।
জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও সদর উপজেলা কমিটির সভাপতি সৈয়দ মিজানুর রহমানের মতে, ‘নতজানু নেতৃত্বের কারণে ফেনীতে বিএনপি দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিগত উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনে জেলা নেতৃত্ব জোরালো কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।’
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, ফেনীতে বিএনপির রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল অনেক পুরোনো। তবে সর্বশেষ সংকটের সৃষ্টি হয় ২০০৯ সালে, দলের জেলা কমিটি গঠনের পর। তখন খালেদা জিয়ার ভাই মেজর (অব.) সাইদ এস্কান্দারকে সভাপতি ও ব্যবসায়ী জিয়া উদ্দিন ওরফে মিস্টারকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে দলের তখনকার দুই সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেন ও জয়নাল আবেদীনের (ভিপি জয়নাল) অনুসারীদের কোনো পদে রাখা হয়নি। এ দুজন ১৯৯৭ সাল থেকে যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন। জেলা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কোনো কমিটিতে ঠাঁই না পাওয়া এ দুই নেতার অনুসারীরা এরপর থেকে নিষ্ক্রিয়।
আর সাইদ এস্কান্দারের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির একটা অংশ আবার মাঠ পর্যায়ে দলের নেতা-কর্মীদের কাছে পরিচিত নয়। এঁদের মধ্যে অন্তত ১২ জন নেতা ঢাকায় বসবাস করেন। বড় উৎসব-পার্বণে এলাকায় আসেন। এ ছাড়া বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের জেলা, সদর থানা ও পৌর কমিটির বেশির ভাগ পদ পান ফেনী শহরের একটি বিশেষ বাড়ির লোকজন। এ নিয়েও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
এ ছাড়া জেলা বিএনপির কমিটি কত সদস্যবিশিষ্ট, সেটাও দলের নেতারা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেননি। জেলা সহসভাপতি সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, জেলা বিএনপিতে কমিটির সদস্য কতজন, সেটা প্রয়াত সভাপতি সাইদ এস্কান্দার ও কারাবন্দী সাধারণ সম্পাদক জিয়া উদ্দিন ছাড়া অন্য কেউ জানেন না। তিনি বলেন, ২০০৯ সালে জেলা বিএনপির বর্তমান কমিটি গঠিত হওয়ার পর শুধু একটি পরিচিতি সভা হয়েছে। তাতে কমিটির অর্ধেক সদস্যও উপস্থিত ছিলেন না। এরপর কমিটির আর কোনো সভা হয়েছে কি না, তাঁর জানা নেই।
বিএনপির কেন্দ্র থেকে ঘোষিত কর্মসূচিগুলো পালিত হয় দায়সারাভাবে। সাইদ এস্কান্দারের অনুসারী তথা বর্তমান কমিটি এসব কর্মসূচি পালন করে, তাতে ভিপি জয়নালের অনুসারীদের দেখা যায় না। জেলা ছাত্রদলের দুটি কমিটি। তারা পৃথকভাবে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করে। সেটাও মূল দলের মতো দায়সারাভাবে। ভিপি জয়নাল বিভিন্ন সময়ে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের নামে সমাবেশ করেছেন। তাতে শুধু তাঁর অনুসারীরাই অংশ নেন।
২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে সাইদ এস্কান্দার মারা যান। এরপর থেকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন আইনজীবী আবু তাহের। তিনি গত মার্চে গ্রেপ্তার হন। সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছেন। সাধারণ সম্পাদক জিয়া উদ্দিনসহ প্রায় ৪০০ নেতা-কর্মী এখনো কারাগারে আছেন বলে দাবি করেন আবু তাহের।
সাইদ এস্কান্দারের মৃত্যুর পর তাঁর অনুসারীদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক নারী সাংসদ রেহানা আক্তার (রানু)। তিনি প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ফেনী জেলা বিএনপিতে কোনো দ্বিধাবিভক্তি নেই। যেটা আছে, সেটা নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, যা সব বড় দলেই থাকে।
এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ভিপি জয়নাল। তিনি বলেন, ‘আমি দলের কোনো দায়িত্বে নেই। তাই এ নিয়ে কিছু বলতে চাই না।’

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *