রাজনীতি

ফেনীর রাজনীতি: জেলা আওয়ামী লীগ নিজাম হাজারীই শেষ কথা

ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে ফেনী-২ আসনের সাংসদ নিজাম উদ্দিন হাজারীকে ঘিরে। এখানে দলের সকল পর্যায়ে তাঁর কথাই শেষ কথা।
একসময় দলে এ নিয়ন্ত্রণ ছিল জয়নাল হাজারীর। সন্ত্রাসের কারণে কুখ্যাতি অর্জনকারী এই নেতার এখন আর ফেনীর রাজনীতিতে কোনো স্থান নেই। দীর্ঘ ১৬ বছর পর ২০১৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়। এতে আবদুর রহমান সভাপতি ও নিজাম হাজারী সাধারণ সম্পাদক হন। বাদ পড়েন জয়নাল হাজারী।
আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা বলছেন, জেলা কমিটিতে কিছু প্রবীণ নেতা স্থান পেলেও নবীনদের সংখ্যাই বেশি। তাঁদের সব কর্মকাণ্ড চলে মূলত নিজাম হাজারীকে ঘিরে। দলের ভেতরে জ্যেষ্ঠ নেতাদের কেউ কেউ নবীনদের এই বলয়কে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন একাধিক নেতা বলেন, ক্ষমতার দম্ভ ও অর্থের মোহে পড়ে এসব নবীনের একটা অংশ নানা অপরাধ ও সংঘাতেও জড়াচ্ছে।
অবশ্য নিজাম উদ্দিন হাজারী প্রথম আলোকে বলেন, ‘দলে নতুন নেতৃত্ব আসবে, এটাই স্বাভাবিক। গুরুত্বপূর্ণ কোনো জ্যেষ্ঠ নেতাকে বাদ দিয়ে কিছু হয়নি। নবীন-প্রবীণে মিলে আমরা কমিটি গঠন করেছি। সবাই মিলেমিশে কাজ করছি।’
ফেনী জেলায় তিনটি সংসদীয় আসন। গত বছরের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ফেনী-১ (ফুলগাজী-পরশুরাম-ছাগলনাইয়া) আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ হন মহাজোটের প্রার্থী জাসদের শিরীন আখতার। ফেনী-৩ (সোনাগাজী-দাগনভূঞা) আসন জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিলেও এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সাংসদ হন সৌদি আরবের জেদ্দা আওয়ামী লীগের সভাপতি রহিম উল্যাহ। আর ফেনী-২ (সদর উপজেলা) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ হন নিজাম হাজারী। তিনটি আসনেই নিজাম হাজারীর একচ্ছত্র প্রভাব রয়েছে। কেবল সোনাগাজীতে আওয়ামী লীগের একটা অংশ সাংসদ রহিম উল্যাহর অনুসারী। কিন্তু তারা খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। রহিম উল্যাহ নিজেই চাপের মুখে আছেন। কয়েক দফা হেনস্তাও হয়েছেন দলীয় প্রতিপক্ষের হাতে।
সোনাগাজীর বাইরে বাকি চারটি উপজেলায় আওয়ামী লীগে দৃশ্যত কোনো বিরোধ নেই। তারপরও গত ১৩ মাসে ফেনী সদরে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের তিন নেতা নিজ দলীয় প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন। এর মধ্যে গত বছরের ২০ মে সবচেয়ে নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটে ফেনী শহরে। ওই দিন সকালে ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একরামুল হককে গুলি করে হত্যার পর গাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। একরাম হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে যে ৫৬ জনকে আসামি করা হয়েছে, তাঁদের একজন ছাড়া বাকি সবাই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। এরপর পৃথক ঘটনায় খুন হন সদর উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়ন যুবলীগের সহসভাপতি রসুল আমিন ওরফে মানিক ও সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নের ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক সাইফুল ইসলাম। এই দুটি হত্যা মামলার আসামিরাও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা-কর্মী।
অবশ্য জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুর রহমান দাবি করেন, ফেনীতে আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। দলের সব কর্মসূচি সবাই মিলেমিশে পালন করছেন।
এর আগে দীর্ঘদিন ধরে ফেনীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জয়নাল হাজারীই শেষ কথা ছিল। তিনি ১৯৯৭ সালে সম্মেলনের মধ্য দিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। এরপর বেপরোয়া সন্ত্রাসের কারণে গডফাদার পরিচিতি পাওয়া এই নেতা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০১ সালের ১৬ আগস্ট রাতে যৌথ বাহিনীর অভিযানের মুখে দেশ ছেড়ে পালান। পরে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। সাত বছর পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলে জয়নাল হাজারী দেশে ফেরেন। আবার দলে নিজের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু একপর্যায়ে তিনি ছাত্রলীগ ও যুবলীগের তরুণ নেতৃত্বের কাছে পরাজিত হন। ফেনী ছেড়ে ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। অপরদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক প্রটোকল অফিসার আলাউদ্দিন নাসিমের পৃষ্ঠপোষকতায় ধীরে ধীরে দলের নেতৃত্বে আসেন নিজাম হাজারী।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *