ভ্রমন

তিনাপ সাইতারে একদিন

লেখক: ড. জিনিয়া রহমান

বম ভাষায় সাইতার অর্থ ঝরনা। আর ঝরনা মানেই প্রকৃতি, ঝরনা মানেই প্রাণচাঞ্চল্য, ঝরনা মানেই আনন্দে অবগাহন। তিনাপ সাইতার বাংলাদেশের একটি অন্যতম সুন্দর ঝরনা, যেখানে পৌঁছানোর জন্য বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার গহিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পিঠে ভারী ব্যাগ নিয়ে, পাহাড়ি উঁচু নিচু পথে জোঁকের কামড় খেতে খেতে হাঁটতে হয়।

তিনাপ সাইতারের সামনে লেখক

বর্ষায় তিনাপ সাইতারকে পাওয়া যায় সবচেয়ে মোহনীয় রূপে। এমনই এক বর্ষায় মুখোমুখি হলাম তিনাপের। সে অবর্ণনীয় সৌন্দর্যের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। ৬৫ ফুট উচ্চতার তিনাপের সামনে দাঁড়ালে নিজেকে তুচ্ছ মনে হয়। সেই তুচ্ছতায় ম্লান হয়ে যায় জাগতিক সব দুঃখ আর বিষাদের অনুভূতি। ঝরনার পানিতে রংধনুর সাত রঙের খেলা সম্মোহিত করে রাখে মনকে। পানির স্রোতের শব্দের সাথে তুলনা করা যায় না কোনো পার্থিব সুরের। ঝরনার অবগাহনে ধুয়ে মুছে যায় জীবনের সব চাওয়া পাওয়ার হিসাব। হয়ে উঠি অন্য আরেক মানুষ, আরও শুদ্ধ, আরও পূর্ণ রূপে।

ঝিরি ধরে তিনাপের পথে

পাহাড়ে গেলে দল বেঁধেই যাওয়া ভালো। এতে নিরাপত্তা বাড়ে, যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। তাই দল বেঁধে রওনা হলাম তিনাপের উদ্দেশ্যে। ঢাকা থেকে রাতের বাসে রওনা হয়ে ভোরেই পৌঁছে গেলাম বান্দরবান সদরে। দেরি না করে আগে থেকেই রিজার্ভ করে রাখা চান্দের গাড়িতে রওনা হলাম রুমার উদ্দেশ্যে।

মাঝে মাঝেই গাড়ি থামিয়ে দেখছিলাম মেঘের সমুদ্রে সূর্যোদয়ের রঙের খেলা। যেন অচেনা এক পৃথিবীর দরজা খুলে যায় চোখের সামনে, মনে হয় একটু পা বাড়ালেই পৌঁছে যাব পৃথিবীর বাইরে কোথাও। রুমা পৌঁছে সকালের নাস্তা আর প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে, সেনাবাহিনীর অনুমতি নিয়ে রওনা হলাম মুনন্যায়াম পাড়ার পথে। রাতটা সেখানেই কাটিয়ে পর দিন সকালে শুরু হলো তিনাপের পথে যাত্রা।

তিনাপের পানিতে রংধনু সাত রঙের খেলা

মুনন্যায়াম পাড়ার আর্মি ক্যাম্পকে পিছনে ফেলে অপ্রচলিত এক ট্রেক দিয়ে আমরা হাঁটা শুরু করলাম গাইডকে অনুসরণ করে। গাইড হিসেবে মুনন্যায়াম পাড়ারই দুইজন আদিবাসী ছিল আমাদের সাথে। বেশ খানিকটা নিচে নেমে ঝিরিতে পৌঁছে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম আর ঝিরির সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। আবার শুরু হলো হাঁটা। ঝরনা দেখে সেদিনই বান্দরবান পৌঁছে ঢাকার বাস ধরার পরিকল্পনা থাকার কারণে ইচ্ছা থাকায় ঝিরি পথে বা পাহাড়ি পথে সময় কাটানো সম্ভব হয়নি।

তিনাপের সামনে ভ্রমণপিয়াসুদের উল্লাস

প্রায় তিন ঘণ্টা হাঁটার পরে হঠাৎ খাড়া একটা ঢাল পেলাম, যেটা নেমে গেছে তিনাপের কাছে। নীচ থেকে ভেসে আসছে ঝরনার শব্দ। দড়ি বেয়ে কোনোরকমে একজন একজন করে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নামার মিনিটখানেক পরেই দেখা হলো প্রতীক্ষিত সেই সুন্দরী ঝরনা তিনাপের সাথে। নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। কাছে গিয়ে দেখলাম রংধনুর অর্ধ বৃত্ত। সেই অর্ধবৃত্তে নিজেকে আটকে অবগাহন করলাম তিনাপের জলে। সেই ঠান্ডা জলে ভেসে যাচ্ছিল সব ক্লান্তি, গ্লানি, দুঃখ আর দৈন্যতা। উৎফুল্ল মনে ফিরে এলাম ব্যস্ত শহরে আরও শক্তি, আরও স্পৃহা নিয়ে।

যেভাবে যেতে হবে

ঢাকার কলাবাগান, ফকিরাপুল বা সায়েদাবাদ থেকে বান্দরবানে যাবার সরাসরি বাস আছে। বান্দরবান পৌঁছে বাসে করে বা চাদের গাড়ি রিজার্ভ করে রোয়াংছড়ি বা রুমা যেতে হবে। রোয়াংছড়ি থেকে ট্রেকিং করে পাইংক্ষং পাড়া, রনিন পাড়া আর দেবছড়া পাড়া হয়ে তিনাপ সাইতারে যেতে হবে। রুমা থেকে মুনন্যায়াম পাড়া পর্যন্ত চাদের গাড়িতে যেয়ে সেখান থেকে তিনাপ সাইতার পর্যন্ত ট্রেকিং করে যেতে হবে।

উল্লেখ্য, তিনাপ সাইতারে যেতে হলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অনুমতি লাগে।

তথসুত্র:প্রিয়.কম

Comments

comments