নির্বাচিত ফেনী

গ্রীন টাউন বাস সার্ভিস ছোট শহরের বড় ভাবনা

green town service bus

আবুল খায়ের টিটু

পৃথিবীর অধিকাংশ বড় শহরগুলোই গণপরিবহনের ব্যবস্থার মাধ্যমে সীমিত এলাকায় যোগাযোগের জন্য অতিরিক্ত মানুষের চাপ নিয়ন্ত্রণ করে। উন্নত, আধাউন্নত, উন্নয়নশীল, অনুন্নত, দরিদ্র-অর্থনীতির বিচারে যে আখ্যাই দেয়া হোক না কেন, শহরের যানজট নিরসনে এ গণপরিবহন ব্যবস্থার বিকল্প এখনো দেখা যায়নি। যাত্রীসেবার মান বিবেচনায় কোন শহর এগিয়ে সে নিয়ে বিস্তর যুক্তি তর্ক হতে পারে। কিন্তু যাত্রীসেবা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার আকাক্সক্ষার ক্ষেত্রে পৃথিবীর সকল শহর, নগর বা মহানগরের প্রশাসকগণের মানসিকতার একটি মিল থাকার সম্ভাবনা অধিক।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার চাপ সামাল দিতে দেশের প্রায় প্রতিটি মহানগরই হিমশিম খাচ্ছে। বেশিরভাগ মহানগরেই গণপরিবহনের ব্যবস্থা চালু আছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু দেশের জেলা শহরগুলোর মধ্যে ১৯৫৮ সালে স্থাপিত ফেনী পৌরসভা শহর ব্যবস্থাপনায় গ্রীন টাউন সার্ভিস চালু করে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করছে। যানজট দূরীকরণে ফেনী পৌরসভা ২০০৬ সাল থেকে পৌরসভার দু’টি রুটে (সদর হাসপাতাল থেকে ট্রাঙ্ক রোড হয়ে মহিপাল এবং সদর হাসপাতাল থেকে সালাউদ্দিন মোড় হয়ে লালপুল) স্বল্প ভাড়ায় এ সেবা শুরু করে। বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী এ শহরের অনেক ঐতিহ্যের মাঝে নব সংযুক্তি হিসেবে ইতোমধ্যে সাড়া ফেলেছে এ সেবা। গ্রীন টাউন সার্ভিসে প্রতি রুটে ২৩টির মতো বাস চলমান বলে বাসের কয়েকজন সহকারীর (কন্ডাকটর) কাছ থেকে জানা যায়। যাত্রা শুরুর স্থান থেকে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট সময়। সঠিকভাবে যাত্রী সাধারণ এ সেবা ভোগ করতে পারছেন কিনা তা তদারকির জন্য নির্ধারিত লাইনম্যান রয়েছেন। সে কারণে কোন বাস এক স্টেশনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগ নেই। ঠিক উন্নত দেশের শহরগুলোতে যেমন ব্যবস্থা থাকে তেমনভাবে।

গ্রীন টাউন সার্ভিস নামকরণে ও সবুজ রঙকরণে মফস্বলের এ পৌরসভার মধ্যে সবুজায়নের বৈশি^ক আন্দোলনে সমর্থনের আভাষ পাওয়া যায়। শহরকে পরিবেশবান্ধব ও সবুজ রাখার মানসে এ নামকরণ করা হয় বলেই আমার ধারণা। এ ধরনের অভিনব ও যুগোপযোগী সেবা প্রদানের সিদ্ধান্ত এবং নামকরণ ভিন্ন শহর থেকে আগত সচেতন নাগরিকগণকে চমকে দেয়। যেমন ভাবে চমকে দেয় ফেনী শহরের মূল সড়কগুলোতে বিদ্যমান ডিভাইডারগুলো, যা দেশের অন্য জেলা শহরগুলোতে সচরাচর দেখা যায় না।

দেশ-বিদেশের বিভিন্ন শহর ও নগরের গণপরিবহন ব্যবস্থার তুলনামূলক চিত্র পর্যালোচনা করে গ্রীন টাউন সার্ভিস এর অগ্রগামীতা বিচার করা যাবে। ফেনী পৌরসভার ওয়েবসাইট মতে (২৬ মে ২০১৬) এ পৌরসভায় বর্তমানে প্রায় তিন লক্ষ লোকের বাস। এ শহরের নিকটতম মহানগর (সিটি কর্পোরেশন: ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত) কুমিল্লায় এখনো চালু হয়নি নগর পরিবহনের ব্যবস্থা। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে প্রবল যানজটের শিকার কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রধান সড়কগুলো। যতদূর জানা যায়, নোয়াখালী ও চাঁদপুর সদর পৌরসভায়ও এমন সেবা নেই। দেশের ব্যস্ততম ঢাকা মহানগরে নগর পরিবহনের ব্যবস্থা বহু আগে থেকে থাকলেও কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা অনুপস্থিত। এ অব্যবস্থাপনার জন্য প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাবের চেয়ে জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ, স্থানের স্বল্পতা, সম্পদের অভাবসহ নানকারণ চিহ্নিত করা যেতে পারে। কিন্তু এ দিক থেকেই ফেনী পৌরসভা ব্যতিক্রম ও পথিকৃৎ। সেজন্যে এ পৌরসভার ওয়েবসাইটে “আধুনিকায়ন ও ডিজিটালকরণে ফেনী পৌরসভার অবস্থান বাংলাদেশের শীর্ষে” এমন গর্ব প্রকাশ অতিরঞ্জিত মনে হয় না।

নিয়মিত যাত্রী পরিবহনের জন্য বাসের বর্তমান সংখ্যাটি যথেষ্ট নয়, একথা অনুধাবন করা খুব সহজ। তাই যাতায়াতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে রাস্তায় ভিড় করছে প্রচুর পরিমাণে রিক্সা ও ব্যাটারীচালিত ইজিবাইক। ফলে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ যানজট। তাই যানজট নিরসনের যে মহৎ উদ্দেশ্যে তৎকালীন পৌর প্রধান নূরুল আফসার এর নেতৃত্বে গ্রীন টাউন সার্ভিস যাত্রা শুরু করেছিল তা অনেকটাই ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি শহরের ভিতরে চলাচলকারী অতিরিক্ত যানবাহনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় হিমশিম খাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ। তাই এ সার্ভিসকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ ও পর্যায়ক্রমে সেগুলো বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি এবং যা জাতীয় পর্যায়ে অগ্রগামীতা ধরে রাখার নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা পালন করবে।

লৌহমানবী মার্গারেট থ্যাচারের আমলে বৃটেনে বেসরকারীকরণের (প্রাইভেটাইজেশন) যে বিপ্লব শুরু হয় তার পরিক্রমায় লন্ডনের পরিবহন নিয়ন্ত্রণের জন্য গঠিত হয় ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন (টিএফএল)। যার অধীনে লন্ডনের বাস, ট্রাম, পাতাল রেল, উড়াল রেল, কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত রেল-ডিএলআর (ডকল্যান্ডস লাইট রেলওয়ে), রিভার বাস প্রভৃতি নিয়ন্ত্রিত হয়। লন্ডনের লাল রঙের বাস সে শহরের ঐতিহ্যের অংশ, আর সবুজ রঙ এখন ফেনী শহরের ঐতিহ্য। প্রায় এক কোটি ৩০ লক্ষ মানুষের পরিবহনের সুব্যবস্থার অংশ হিসেবে পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও উন্নত লন্ডন শহর চার স্তরবিশিষ্ট (পাতাল পথ, সড়ক পথ, উড়াল পথ, নদীপথ) যোগাযোগ বলয় তৈরি করেছে। সচেতন পাঠক লন্ডন ও ফেনী শহরের মধ্যে এ অসম তুলনার জন্য আমাকে ভর্ৎসনা না করে নগর পরিবহন ব্যবস্থায় দুই শহরের ‘চিন্তা’র মিলটিকে গুরুত্ব দেবেন বলে আশা করি। লন্ডনের ইতিবাচক দিক বর্ণনা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং নগর পরিকল্পনায় চিন্তার সাদৃশ্যের কারণে ফেনীর গ্রীন টাউন সার্ভিসও অধিকতর মনোযোগের দাবিদার। ক্রমাগত সুবিধা সংযোজনের মাধ্যমে এ সেবাটিও আধুনিক হতে পারে। কী হতে পারে সে সুবিধাগুলো? বাস সংখ্যা বৃদ্ধি, যাত্রী ওঠানো-নামানোর জন্য প্রতি কিলোমিটারে ৩/৪টি নির্দিষ্ট বাস স্টপ, প্রতিটি বাস স্টপে একটি যাত্রী ছাউনি (বর্তমানে রোটারী ক্লাবসহ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত কিছু ছাউনি আছে), সকল বয়সের যাত্রীর ওঠা-নামা সহজ করার জন্য নিচু মেঝের (লো-ফ্লোর) বাস তৈরি করা, রাস্তা থেকে পথচারী হাঁটার রাস্তার (তথা বাস স্টপের) উচ্চতা ও বাসে আরোহনের উচ্চতা কাছাকাছি করা (সে ক্ষেত্রে হুইল চেয়ার ব্যবহারকারী প্রতিবন্ধীদেরও বাসে ওঠা-নামা করা সম্ভব হবে), নিয়মিত যাত্রীদের জন্য কম মূল্যে সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক ও বার্ষিক টিকিটের ব্যবস্থা করা (সেক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যবস্থাগত উৎকর্ষতা অর্জন সম্ভব), বাস সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে চলমান রিক্সা ও অটোরিক্সাগুলোকে শহরে নিষিদ্ধ করে আরো গ্রামের দিকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।

এতদ প্রস্তাবিত সুবিধাদি পৃথিবীর ইতিহাসে নব সংযুক্তি নয়। পৃথিবীর বহু উন্নত শহরগুলোতে এভাবেই সেবা প্রদানের মাধ্যমে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। ফেনী শহর এ মুহুর্তেই এ সংযোজনগুলো করবে এটা আশা করা ভুল হবে। তাই সংযোজন প্রক্রিয়াটি পর্যায়ক্রমিক হতে পারে। ঢাকার সাথে বা অন্যান্য মহানগরের সাথে তুলনায় ফেনী একটি শিশু শহর। তাই শিশুকে গড়ে তোলায় চাই সঠিক পদক্ষেপ ও বাস্তবায়ন। তার মাধ্যমে অগ্রগামী পথিক হওয়ার ক্ষেত্রে এ শহর আরো এগিয়ে যাবে। গ্রীন টাউন বাস সার্ভিসের আধুনিকায়ন তাক লাগিয়ে দিবে পুরো দেশকে এবং ছোট শহরের এরকম বড় ভাবনাই একদিন সারা দেশে উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে।

লেখক: শিক্ষক, মার্কেটিং বিভাগ, ফেনী ইউনিভার্সিটি।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *